♥♥ সব ফরজের বড় ফরজ!

সব ফরজের বড় ফরজ ইসলামী আন্দোলন করা, আল্লাহর হুকুমাত কায়েম করা- এই স্লোগানে দীপ্ত হয়ে একটি রাজনৈতিক দল তাদের কার্জক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। নামাজ, রোজা, হজ্জ্ব, যাকাত এগুলো হচ্ছে এই বড় ফরজের সহায়ক মাত্র, ট্রেনিং! হুকুমাতে ইলাহিয়া কিংবা ইকামাতে দ্বীন প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে আসল লক্ষ্য। এর জন্য মেধা-জান-প্রাণ-মাল
দিয়ে আন্দোলন করতে হবে। আচ্ছা এটাই কি ইসলাম আমাদের নিকট চায় কিংবা আল্লাহ তায়ালা কি এই হুকুমাতে ইলাহিয়া বা ইকামাতে দ্বীনের জন্যে আমাদের সৃষ্টি করেছেন? সেই বিষয়েই কিছুটা আলোচনা করব। ইনশাল্লাহ, ধৈর্য্য ধরে লেখাটি পড়ার তৌফিক আল্লাহতায়ালা আমাদের দান করবেন।  আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالإنْسَ إِلا لِيَعْبُدُونِ অর্থঃ আমি জ্বিন ও মানব
জাতিকে আমার ইবাদত করা ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করিনি। (সূরা যারিয়াতঃ ৫৬)

জ্বিন ও মানুষের সৃষ্টির উদ্দেশ্যই হচ্ছে একটি, তা হল একমাত্র আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করা। যুগে যুগে নবী রাসূলগণ এই দাওয়াত নিয়েই পৃথিবীতে প্রেরিত হয়েছেন। যেমন: সামুদ জাতির নিকট ছালেহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আদ জাতির নিকট হুদ আলাইহি ওয়া সাল্লাম, মাদইয়ান বাসীর নিকট শোয়াইব আলাইহি ওয়া সাল্লাম, নূহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জাতির নিকট একই দাওয়াত দিয়ে সর্বপ্রথম আহবান করেছেন।


يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ

অর্থ: হে আমার জাতি, তোমরা এক আল্লাহ তায়ালার বন্দেগী কর, তিনি ছাড়া তোমাদের

আর কোন ইলাহ নেই। (সূরা আ’রাফ ৭: ৫৯,৬৫,৭৩; সূরা হুদ ১১: ৫০,৬১,৮৪; সূরা মোমেনূন ২৩: ২৩)

কখনই কোন নবী-রাসূল তার কওমের নিকট যেয়ে বলেন নি সবার আগে খিলাফা প্রতিষ্ঠা করতে হবে কিংবা ইসলামী হুকুমাত কায়েম করতে হবে। যদি খিলাফা প্রতষ্ঠা করা উদ্দেশ্য হতো তাহলে মক্কায় যখন মুশরিকরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রস্তাব দিয়েছিল তোমাকে আমাদের রাজা বানাবো, অঢেল সম্পত্তি তোমাকে দিব, কোন সুন্দরী নারীকে বিয়ে করতে চাও তাও দিব কিন্তু আমাদের সাথে কিছু ব্যাপারে ছাড় বা সমঝোতা করে নিতে হবে। তাহলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখনই ক্ষমতার মসনদে বসতেন, বর্তমানে প্রচলিত ইসলাম নামধারী রাজনৈতিক দলগুলোর মত চিন্তা করতেন যে কোন উপায়ে আগে খিলাফত তারপর দ্বীন কায়েম! কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো তা করেন নি! সর্বপ্রথম তাওহীদের দিকে মানুষকে আহবান করেছেন। ঈমান সম্পর্কিত শিক্ষা দিয়েছেন, তাদের আকীদা সহীহ করেছেন। যখন একদল মানুষ তৈরী হল তখন আল্লাহ তাআলা তাদের খিলাফত দান করলেন। এই মানুষগুলো যখন অন্যদের দাওয়াত দিতেন কখনই এই বলে দাওয়াত দেননি আমাদের ক্ষমতার মসনদে বসতে হবে আগে, আমাদের সাথে যোগ দাও, আমাদের ক্ষমতার মসনদে বসার সাথে ঐক্যমত হয়ে তোমরা শির্ক কর আর যাই কর তাতে আমাদের আপত্তি নেই! কই এমনটিতো ঘটেনি। তাহলে আজকের জামানার ইসলামী দলগুলো কিসের দাওয়াত দিচ্ছে?


অবস্থা এতটাই করুন হয়ে দাড়িয়েছে যখন ইসলামী রাজনৈতি দলভুক্ত কাউকে যদি বলা হয়, ভাই, তাওহীদ সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জন করুন, আকীদা সহীহ করুন, শির্ক থেকে মুক্ত থাকুন, বিদআত থেকে দূরে থাকুন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন যাপন করুন, নামায পড়াটা সহীহ করুন কিন্তু এর উত্তরে যা পাওয়া যায় তা মোটেই সন্তোষজনক নয়। উদাহরণ স্বরুপ: সব ফরজের বড় ফরজ দ্বীন কায়েম! হুকুমাতে ইলাহিয়া সবার আগে, আগে দ্বীন কায়েম তারপর অন্যকিছু, আগে খিলাফা প্রতিষ্ঠা করতে হবে তারপর ঈমান-আকীদা নিয়ে ভাবা যাবে, আমাদের এখন সময় নষ্ট করার মতো সময় নেই! আগে দ্বীন কায়েম হোক - দ্বীন কায়েম হলে আল্লাহ ঐ ব্যক্তিকে খুজে বের করবেন না কে টাকনু’র নীচে লম্বা প্যান্ট পড়ল আর কে পড়ল না, কে দাড়ি রাখল আর কে রাখল না! এ যেন রান্না করা ভাত রোপন করে চাল পাবার প্রয়াস!


আল্লাহ তায়ালা বলেন:

وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الأرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَى لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُمْ مِنْ بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا يَعْبُدُونَنِي لا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا وَمَنْ كَفَرَ بَعْدَ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
অর্থ: তোমাদের মধ্যে যারা (আল্লাহ তায়ালার উপর) ঈমান আনে এবং (সে অনুযায়ী) নেক কাজ করে, তাদের সাথে আল্লাহ তায়ালা ওয়াদা করেছেন, তিনি যমীনে তাদের অবশ্যই খিলাফত দান করবেন যেমনিভাবে তিনি তাদের আগের লোকদের খিলাফত দান করেছিলেন, (সর্বোপরি) যে জীবন বিধান তিনি তাদের জন্যে পছন্দ করেছেন তাও তাদের জন্যে (সমাজে ও রাষ্ট্রে) সুদৃঢ় করে দেবেন, তাদের ভীতিজনক অবস্থার পর তিনি তাদের অবস্থাকে (নিরাপত্তা ও) শান্তিতে বদলে দিবেন, (তবে এর জন্য শর্ত হচ্ছে) তারা শুধু আমারই গোলামী করবে, আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না, এরপরও যে (এবং যারা) তাঁর নিয়ামতের নাফরমানী করবে তারাই গুনাহগার (বলে পরিগণিত হবে)। (সূরা নূর: ৫৫)

যারা ঈমান আনবে ও নেক কাজ করবে আল্লাহ তায়ালা তাদের উপর খিলাফা দান করবেন! অর্থাৎ খিলাফা অর্জনের লক্ষ্যে মানুষকে দাওয়াত প্রদান নয় বরং তাওহীদের দিকে এবং এরপর সহীহ সুন্নাহ অনুযায়ী সৎকর্ম করার দিকে মানুষকে আহবান জানাতে হবে। এরপরই আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে শাসন ক্ষমতা দান করবেন, ইসলামকে বিজয়ী দ্বীন হিসাবে প্রতিষ্ঠা করবেন এবং ভীতির বদলে শান্তি দান করবেন, যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে।


আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেনঃ

“তিনিই তাঁর রাসূলকে হেদায়েত ও সত্য ধর্মসহ প্রেরণ করেছেন। যাতে একে অন্য সমস্ত ধর্মের উপর জয়যুক্ত করেন। যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে”। ( সূরা আছ্-ছফঃ ৯)

এখন তাওহীদের দিকে মানুষকে দাওয়াত না দিয়ে যদি বলা হয়, আমাদের ভোট দিন আমরা আল্লাহর দ্বীন কায়েম করব, ইসলামী শাসন ব্যবস্থা কায়েম হবে। তাহলে এটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াতের পথ ও পদ্ধতী অনুযায়ী হল না! মানুষ শির্কে লিপ্ত, বিদআতে লিপ্ত তাদেরকে শির্কমুক্ত না করে, একমাত্র আল্লাহর জন্যই সকল ইবাদত খালেস না করে, সহীহ সুন্নাহ’র অনুসারী হওয়ার আহবান না জানিয়ে ইসলামী হুকুমাত প্রতিষ্ঠার দাওয়াত কিংবা খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্যে সংগ্রাম সবই নিস্ফল, ব্যর্থ পর্যবেসিত হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে অনেকেই যুক্তি প্রদান করে থাকেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাক্কী জীবনে তো কাবায় মূর্তি রেখেই দাওয়াত দিয়েছেন ইসলামী হুকুমাত কায়েম হওয়ার পরই এই মূর্তিগুলো অপসারণ করেছেন। এই যুক্তির ক্ষেত্রে জন্য বলতে হয়- যাদের উপর ইসলামী খিলাফাত আল্লাহ দান করেছিলেন তারা কি শির্কে লিপ্ত ছিল? তারা কি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কর্মপদ্ধতী বাদ দিয়ে নিজস্ব পন্থায় ইবাদত করতো? তারা কি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিষেধ অমান্য করে বলতো আগে ইসলামী হুকুমাত চাই পরে আপনার কথা শুনবো! আল্লাহু আকবর, সুনহানাল্লাহ, না, কখনই এমনটি ঘটে নি!


জমিনে আল্লাহর আইন অনুযায়ী জীবন ধারণ করাও আল্লাহর ইবাদতের অন্তর্ভূক্ত। এই কথাটি মুসলিম মাত্র সবারই বোধগম্য। সব ফরজের বড় ফরজ এটা নয়, বরং আল্লাহর ইবাদত করারই একটি অংশ এটি। নবী রাসূলগণ সর্বপ্রথম মানুষকে একত্ববাদের দিকে ডাকতেন, সর্বময় কর্তৃত্ব আল্লাহর হাতে, একদিন আল্লাহর নিকট দাড়াতে হবে, আল্লাহকে ভয় করুন, আল্লাহর আদেশ মেনে চলুন, ইবাদত করতে যেয়ে নবীরাসূলদের অনুসরণ করার দাওয়াত তারা দিতেন।


আল্লাহ তায়ালা শেষ নবীর উপর নাযিল করে বলেনঃ

قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ
অর্থঃ (হে নবী) তুমি বল, তোমরা যদি আল্লাহ তায়ালাকে ভালবাস, তাহলে আমার কথা মেনে চলো, (আমাকে ভালবাসলে) আল্লাহ তায়ালাও তোমাদের ভালবাসবেন এবং তিনি তোমাদের গুনাহখাতা মাফ করে দিবেন; আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়াবান। (সূরা ইমরানঃ ৩১)

আজকে আক্বীদা সহীহ না থাকার কারণে আহমাদিনেজাদ অনেক তরুনের নিকট হিরো, ইরান ইসলামী প্রজাতন্ত্র। অনেকে ইরানকে একমাত্র ইসলাম প্রতিষ্ঠা বাস্তবায়নকারী দেশ বলে মনে করেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ঐ দেশটিতে সর্বময় আল্লাহর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়নি বরং ইমামদের অন্ধ আনুগত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যেখানে ইমামের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা হচ্ছে তাদের আরকানুল ঈমানের প্রথম স্তর!


লেখা আর বাড়াব না, আমি এবং আমরা সবাই আসুন নিম্নোক্ত বিষয়গুলো সম্পর্কে ‘ক্রিস্টাল ক্লিয়ার’ জ্ঞান অর্জন করার জন্যে সচেষ্ট হই। আল্লাহর রবুবিয়াত, আল্লাহর উলুহিয়াত, আল্লাহ তায়ালার গুনাবলী সেই সাথে এই দুনিয়ার একটি ক্ষুদ্র অংশও কি অন্য কেউ নিয়ন্ত্রণ করে? আল্লাহ ব্যতীত কি অন্যের নিকট দোয়া চাওয়া যায় যেমনঃ কবরের নিকট যেয়ে মৃত ব্যক্তির নিকট? আল্লাহ তায়ালার যে গুণাবলীগুলো রয়েছে সেগুলো কি কোন মানুষের পক্ষে অর্জন করা সম্ভব উদাহরণ স্বরপঃ কেউ একজন দাবী করল সে অতীত, ভবিষ্যত, বর্তমান সব জানে? ইবাদত করার ক্ষেত্রে কার অনুসরণ করা ফরজ এবং তার পূর্ণরুপ অনুসরণ ব্যতীত কি ইবাদত কবুল হবে? নতুন পন্থায় ইবাদত আবিস্কার করার রাস্তা কি আমাদের জন্যে খোলা আছে? সর্বপরি, শির্ক এবং বিদআত সম্পর্কে সতর্ক হওয়া। 
আল্লাহ তায়ালা আমাদের হক কথা বুঝার তৌফিক দান করুন, আমীন।